২০২৬ সালে দেশে DENV-3-এর প্রাধান্য; তবে ‘নতুন ভেরিয়েন্ট’ নয়, বদলেছে কোন সেরোটাইপ বেশি ছড়াচ্ছে
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু ভাইরাসের কোন ধরন বেশি ছড়াচ্ছে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR)-এর সাম্প্রতিক নজরদারি তথ্য বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে DENV-2-এর প্রাধান্য থাকলেও ২০২৬ সালে পরীক্ষিত নমুনায় DENV-3-এর আধিক্য দেখা যাচ্ছে। তবে এটিকে ডেঙ্গুর নতুন কোনো ‘ভেরিয়েন্ট’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়; DENV-1, DENV-2, DENV-3 ও DENV-4—ডেঙ্গু ভাইরাসের পরিচিত চারটি সেরোটাইপ।
IEDCR-এর হাসপাতালভিত্তিক নজরদারি অনুযায়ী, ২০২৬ সালে নয়টি হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করা ১ হাজার ৯৭টি NS1-positive নমুনার মধ্যে ৭১টির সেরোটাইপ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষিত নমুনার ৯১ দশমিক ৫ শতাংশে DENV-3 এবং ৮ দশমিক ৫ শতাংশে DENV-2 শনাক্ত হয়েছে। তবে এই নমুনার সংখ্যা সীমিত এবং এটি দেশের প্রতিটি রোগীর প্রতিনিধিত্ব করে না—ফলে পুরো দেশের পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রাখা জরুরি।
গত বছরের নজরদারিতে চিত্রটি ছিল ভিন্ন। ২০২৫ সালের নমুনায় DENV-2 ছিল প্রায় ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ, DENV-3 ছিল ৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ, DENV-1 ছিল ৮ দশমিক ৮ শতাংশ এবং DENV-4 ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ ২০২৬ সালে প্রধান সেরোটাইপের ক্ষেত্রে একটি পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
এখানেই জনসচেতনতার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। কোনো একটি সেরোটাইপকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক’ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। IEDCR-এর পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেছেন, রোগের তীব্রতা নির্ভর করে ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য, রোগীর রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থাসহ একাধিক বিষয়ের ওপর। বিশেষ করে আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির পরবর্তী সংক্রমণ গুরুতর হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতুক হুসাইনও বলেছেন, আগের বছরগুলোতে DENV-2-এর ব্যাপক সংক্রমণের পর DENV-3-এর প্রাধান্য দেখা দিলে ভিন্ন সেরোটাইপে পুনঃসংক্রমণের বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে DENV-3-এর আধিক্যকে এককভাবে গুরুতর রোগ বা মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মতো সিদ্ধান্তে যাওয়া উচিত নয়।
ডেঙ্গুর সম্ভাবনা থাকলে অসুস্থতার সময়কাল অনুযায়ী পরীক্ষা নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের পরীক্ষাগার নির্দেশনায় প্রথম সাত দিনের মধ্যে NS1 ও IgM এবং প্রয়োজনে molecular test ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের CDC-এর বর্তমান নির্দেশনাতেও অসুস্থতার প্রথম ০–৭ দিনের মধ্যে NS1 antigen বা molecular test-এর সঙ্গে IgM পরীক্ষা বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। NS1 positive হলে বর্তমান বা সাম্প্রতিক ডেঙ্গু সংক্রমণের শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়; তবে NS1 negative ফলাফল একাই ডেঙ্গু সম্পূর্ণভাবে বাদ দেয় না।
তাই জ্বর বা জ্বরজ্বর ভাব শুরু হওয়ার চতুর্থ দিনে CBC ও Dengue NS1 পরীক্ষা করা যুক্তিসঙ্গত। CBC-এর মাধ্যমে platelet, WBC এবং hematocritসহ রক্তের গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো দেখা যায়। তবে CBC একা ডেঙ্গু শনাক্ত করার পরীক্ষা নয়; রোগীর উপসর্গ, পরীক্ষার ফল এবং প্রয়োজনে পরবর্তী পরীক্ষার ফল একসঙ্গে মূল্যায়ন করতে হয়।
না। বিশেষজ্ঞ নির্দেশনা অনুযায়ী NS1 negative ফলাফল ডেঙ্গু সংক্রমণকে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে না। CDC বলছে, NS1 negative হলে এবং ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল সন্দেহ থাকলে IgM পরীক্ষা বিবেচনা করা যেতে পারে। WHO-ও প্রথম সাত দিনের পরীক্ষায় negative ফলের ক্ষেত্রে রোগীর উপসর্গ ও সন্দেহের মাত্রা অনুযায়ী পরবর্তী পরীক্ষা বা follow-up specimen বিবেচনার কথা বলেছে।
অর্থাৎ পরীক্ষার ফল হাতে পাওয়ার পর ‘positive’ বা ‘negative’ শব্দটি দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে অসুস্থতার কততম দিনে পরীক্ষা করা হয়েছে—সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।
এমন ধারণাও বিভ্রান্তিকর। ডেঙ্গুতে platelet কমতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের platelet স্বাভাবিকভাবেই অন্যের তুলনায় কিছুটা কম বা বেশি হতে পারে। ফলে কোনো ব্যক্তির আগের CBC-তে platelet কত ছিল, সেটিও চিকিৎসকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে platelet-এর পাশাপাশি hematocrit, রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ, পানিশূন্যতার লক্ষণ এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের চিকিৎসক ডা. শাহনূর সারমিনও platelet-এর সংখ্যা একাই রোগের গুরুতরতা নির্ধারণের ভিত্তি না করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ডেঙ্গুতে জ্বর কমে যাওয়াকে সবসময় সুস্থতার লক্ষণ হিসেবে দেখা যায় না। চিকিৎসকদের মতে, জ্বর কমার পরের ২৪–৪৮ ঘণ্টা অনেক রোগীর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার অনুভূতি, ঠান্ডা হাত-পা, শ্বাসকষ্ট কিংবা রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
DENV-3-এর প্রাধান্য দেখা দিলেও সেরোটাইপ জানার জন্য প্রত্যেক রোগীর আলাদা পরীক্ষা করা সাধারণ চিকিৎসার জন্য আবশ্যক নয়। CDC বলছে, NS1 positive হলে serotype জানা যায় না; serotype শনাক্ত করতে molecular test যেমন RT-PCR/NAAT প্রয়োজন হতে পারে। তবে রোগীর চিকিৎসা পরিচালনার জন্য সাধারণত serotype জানা অপরিহার্য নয়।
অর্থাৎ ২০২৬ সালে DENV-3 বেশি শনাক্ত হচ্ছে—এই তথ্যটি জনস্বাস্থ্য নজরদারি ও গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কোনো রোগীর ক্ষেত্রে করণীয় নির্ধারণে প্রথম গুরুত্ব পায় তার উপসর্গ, অসুস্থতার দিন, পরীক্ষার ফল এবং শারীরিক অবস্থার ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ।
চলতি বছর IEDCR দেশের ৬৪ জেলায় ডেঙ্গুর বিস্তারের কথা জানিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ ১৫টি জেলায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে সংক্রমণ আরও কয়েক সপ্তাহ উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে।
তাই জ্বর হলে আতঙ্কিত না হয়ে অসুস্থতার দিন গণনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, উপযুক্ত সময়ে পরীক্ষা করা, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করা এবং সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা জরুরি।